পোড়াবাড়ির চমচম : খ্যাতি যার দেশব্যাপী
টাঙ্গাইলে পোড়াবাড়ির চমচমের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রতিটি চমচমকে মাওয়ার গুঁড়ায় জড়িয়ে দেয়া। পোড়াবাড়ির বিখ্যাত চমচম তৈরির দক্ষ কারিগরের পক্ষেও টাঙ্গাইলের বাইরে গিয়ে এমন সুস্বাদু এবং নরম চমচম তৈরি সম্ভব নয়—জানিয়েছেন এখানকার মিষ্টি তৈরির কারিগররা। এর পেছনের রহস্য অন্য, মূলত পোড়াবাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ধলেশ্বরী নদীর পানির একটি বিশেষ ব্যাপার রয়েছে বলে জানা যায়।
চমচম টমটম গজারির বন
টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন।টাঙ্গাইলকে তুলে ধরার মতো জেলাবাসীর মুখে মুখে প্রচলিত বেশ ক’টি পয়ারের মধ্যে এটি একটি। এই চমচম মানে পোড়াবাড়ির চমচম। এদেশের মানুষের রসনা তৃপ্তির প্রিয় মিষ্টি এটি। শুধু বাঙালিরই নয়, ভারতবর্ষসহ অনেক দেশেরই মানুষের প্রিয় এ মিষ্টির ঐতিহ্য প্রায় দুইশ’ বছরের। বাঙালি ললনার প্রিয় পোশাক টাঙ্গাইল শাড়ির যেমন খ্যাতি তেমনি খ্যাতি এই চমচমের। এমন একসময় ছিল যখন টাঙ্গাইলের বধূরা শুষ্ক মৌসুমে টমটম বা টাংগাযোগে (ঘোড়ায় টানা গাড়ি) আর বর্ষা মৌসুমে নৌকায় নাইওরে যাওয়ার সময় বাড়িতে তৈরি পিঠা-পুলির সাথে নিতেন চমচমের হাঁড়ি। সে সময় চমচমসহ সব মিষ্টিই বিক্রি হতো মাটির হাঁড়িতে। এখন সেখানে স্থান করে নিয়েছে কাগজের প্যাকেট।
শুধু টাঙ্গাইল নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে পোড়াবাড়ির চমচম পরিবেশন করা হলে অনুষ্ঠানের মান বিশেষ মাত্রা পায়। আর টাঙ্গাইলে বৈশাখী উত্সবে পান্তা-ইলিশের পাশাপাশি চমচম না থাকলে যেন অনুষ্ঠানই জমে না। চমচমের জন্য বিখ্যাত টাঙ্গাইলে আরও তৈরি হয় হরেক মিষ্টি। তারও নানা বৈশিষ্ট্য থাকলেও চমচমই তাকে করেছে মিষ্টির জেলা হিসেবে খ্যাতিমান। প্রতি বছর গ্রামে গ্রামে বসা বৈশাখী মেলাগুলোতেও জিলেপি আর রসগোল্লা ছাড়াও পুরোনো ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রেখে এখনো মাটির হাঁড়িতে ভরেই বিক্রি হয় চমচম।
‘পোড়াবাড়ির চমচম’—নামটি শুনলেই জিভে পানি এসে যায়—এর অতুলনীয় স্বাদের কারণে। পোড়া ইটের মতো রঙের চমচমের স্বাদের আসল জায়গাটি হচ্ছে ভেতরের গোলাপি আভাযুক্ত মৌচাকের মতো ফাঁপা নরম অংশ। দক্ষ কারিগররা দিন দিন এই বিশেষ খাবারটাকে লোভনীয় করে তুলেছেন, করেছেন ব্যাপক জনপ্রিয়।
পোড়াবাড়ি। টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত একটি গ্রাম। এই গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিমে আরেক গ্রাম চারাবাড়ি। এই এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ধলেশ্বরী নদী। এই নদীর তীরে চারাবাড়িতে আগে স্টিমার ঘাট ছিল। সেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে স্টিমার, লঞ্চসহ বড় বড় নৌকা এসে ভিড়ত। ব্রিটিশ শাসনামলে এই পথ দিয়ে আসাম-কলকতার স্টিমারেরও চলাচল ছিল। ফলে এই চমচমের সুনাম একদিকে যেমন দেশে ছিল, অন্যদিকে দেশের বাইরেও এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। এখনো এর সুনাম রয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ভোজন রসিক বা রসনা প্রিয় লোকদের মধ্যে।
ধলেশ্বরী নদী এখন প্রায় খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুম ছাড়া নাব্যতা থাকে না। লঞ্চ, স্টিমার চলাচল তো দূরের কথা; ভরা বর্ষায়ও নৌকা চলা ভার। এ অবস্থাসহ নানা কারণে পোড়াবাড়ি তার মিষ্টির ঐতিহ্য হারাতে বসলেও এখনো পর্যন্ত কয়েকটি পরিবার টিকে আছে মিষ্টি তৈরির উপর নির্ভর করে।
এমনি একজন মিষ্টি ব্যবসায়ী গদন গৌড় জানান, পোড়াবাড়ি বাজারে এখন চারটি ও চারাবাড়ি বাজারে তিনটি মাত্র মিষ্টির দোকান থাকলেও এই এলাকায় চমচম তৈরির কারখানা রয়েছে ১৩টি। এই কারখানায় গড়ে প্রতিদিন দশ মণ করে চমচম প্রস্তুত হয় এবং এর প্রায় পুরোটাই রাজধানী ঢাকায় সরবরাহ হয়ে থাকে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী সন্তোষেও রয়েছে তিনটি বড় কারখানা। এগুলোতেও দশ থেকে বারো মণ চমচম প্রস্তুত হয়, যার পুরোটাই সরবরাহ হয় ঢাকায়। আর এখান থেকেই সরবারাহ করা মিষ্টি বিক্রি হয় ঢাকার অনেকগুলো দোকানে।
টাঙ্গাইল শহরে মিষ্টি পট্টি নামে খ্যাত একটি এলাকা রয়েছে, যেখানে মিষ্টির দোকান আছে প্রায় ২৫টি। এছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় আরও ২৫টি দোকান রয়েছে। মিষ্টি ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক পূণ্য সরকার জানান, টাঙ্গাইলের মিষ্টির দোকানগুলোতে প্রায় বারোশ শ্রমিক কাজ করেন। এরমধ্যে মিষ্টি পট্টির দোকানগুলোর শ্রমিক সংখ্যা প্রায় সাতশ। এখানে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার কেজি চমচম প্রস্তুত হয়। চমচম ছাড়াও এখানে রসগোল্লা, পানিতোয়া, আমিত্তি (অমৃত), রাজভোগ, মোহনভোগ, জিলিপি ও দই প্রস্তুত ও বিক্রি হয়। প্রয়োজনীয় পরিমাণ দুধ পাওয়াই এখন বড় সমস্যা। এই মিষ্টি তৈরি হয় দেশি গাভীর দুধ থেকে। বিদেশি জাতের গাভীর দুধের মিষ্টি ততটা সুস্বাদু হয় না। তবে ছোট ছোট কোনো কোনো দোকানে তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়া বিদেশি জাতের গাভীর দুধেও মিষ্টি তৈরি করা হয়। চমচম তৈরির উপকরণ বলতে শুধুই দুধের ছানা আর চিনি। ছানার ময়ান বানাতে আর চিনির শিরা তৈরিতে লাগে পানি। তবে দুধের মূল্য বৃদ্ধির কারণে কোথাও কোথাও ছানার সাথে ময়দা মেশানোর কথা শোনা যায়। এতে চমচেমর স্বাদ আর মান দুটোই কমে। এ চমচম মুখে দিয়ে এর নরম আর মোলায়েম ভাবটি পাওয়া যায় না। টাঙ্গাইলে পোড়াবাড়ির চমচমের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রতিটি চমচমকে মাওয়ার গুঁড়ায় জড়িয়ে দেয়া।
পোড়াবাড়ির বিখ্যাত চমচম তৈরির দক্ষ কারিগরের পক্ষেও টাঙ্গাইলের বাইরে গিয়ে এমন সুস্বাদু এবং নরম চমচম তৈরি সম্ভব নয়—জানিয়েছেন এখানকার মিষ্টি তৈরির কারিগররা। এর পেছনের রহস্য অন্য, মূলত পোড়াবাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ধলেশ্বরী নদীর পানির একটি বিশেষ ব্যাপার রয়েছে বলে জানা যায়। এ প্রসঙ্গে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কাছ থেকে শোনা গিয়েছিল একটি কাহিনী। তার আবাস ও রাজনীতির কর্মস্থল সন্তোষে এক বৈঠকি আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, ‘ব্রিটিশ শাসনামলে সন্তোষের জমিদার পরিবারের এক কন্যার বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল কলকাতায়। এই অনুষ্ঠানের অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য পোড়াবাড়ির চমচম দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এই চমচম তৈরির জন্য পোড়াবাড়ি থেকে কয়েকজন দক্ষ কারিগর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেখানে। কয়েকদিন চেষ্টার পরও তারা শেষপর্যন্ত পোড়াবাড়ির মানের চমচম তৈরি করতে ব্যর্থ হন। সেই কারিগররাই জানান, টাঙ্গাইলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা আর বিশেষ করে পোড়াবাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তার শাখা ধলেশ্বরী নদীর পানি ছাড়া একই মানের চমচম তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে পোড়াবাড়ির পানিই এক্ষেত্রে অনন্য। এখানকার মাটির কারণেই পানির এক অজানা বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয় বলে এমনটি ঘটে—এ কথা জানান এখনকার কারিগররাও। আর এ কারণেই টাঙ্গাইল ছাড়া বাইরের কোথাও এ মানের চমচম তৈরি হয় না।
মুক্তাগাছায় গোপালের মণ্ডা বাংলাদেশের ঐতিহ্য
মণ্ডা খেয়ে মহারাজা পেলেন পরম তৃপ্তি, আর বাহবা দিলেন গোপালকে। শুরু হলো মণ্ডার যাত্রা। গোপাল সম্পর্কে জানা যায়, বাংলা ১২০৬ সালে তত্কালীন ভারতবর্ষের মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণকারী এই গোপাল পাল বাংলা ১৩১৪ সালে পরলোকগমণ করেন।
মনোনেশ দাস, মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ)
বাংলাদেশে বিখ্যাত গোপালের মুক্তাগাছার মণ্ডা। মুক্তাগাছায় মণ্ডা অনেকেই তৈরি করেন। অনেক দোকানেই মণ্ডা পাওয়া যায়। যেখানে মণ্ডা তৈরির সকল উপাদানও দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও পাওয়া যায় না গোপাল পালের বংশধরদের তৈরি মণ্ডার স্বাদ। স্বপ্নে পাওয়া সাধুর ফর্মুলায় তৈরি মণ্ডা যার একমাত্র বিক্রেতা গোপাল পালের বংশধর।
উপমহাদেশে এমন কিছু উল্লেখযোগ্য দুধের তৈরি মিষ্টি আছে যার কারণে ওই দেশ এবং অঞ্চল বিখ্যাত। যেমন ভারতের দিল্লির লাড্ডু, আলমোড়ার বালামিঠাই, লাল মোহন, পশ্চিমঙ্গের রাজভোগ রয়্যাল, অমৃতকুম্ভ, রসমালঞ্চ, ছানার টোস্ট, পাকিস্তানের সোনা মিয়ার মিষ্টি, গোলাপজামুন, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার গোলাপজাম ও লাল মোহন উল্লেখযোগ্য। তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে মিশে আছে মুক্তাগাছার গোপাল পালের মণ্ডা, কুমিল্লার রসমালাই, পোড়াবাড়ির চমচম, বগুড়ার দই, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, নেত্রকোনার বালিশ। মুক্তাগাছার মণ্ডার নাম শোনেননি ভোজনরসিকদের মাঝে এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
মণ্ডা নিয়ে একটি কিংবদন্তি রয়েছে। দুই শতাধিক বছর আগে মুক্তাগাছার প্রসিদ্ধ মণ্ডার জনক গোপাল পাল এক রাতে স্বপ্নাদিষ্ট হলেন। শিয়রে দাঁড়িয়ে এক ঋষি তাকে আদেশ দিচ্ছেন, মণ্ডা মিষ্টি তৈরি কর। পরদিন গোপাল ঋষির আদেশে চুল্লি খনন শুরু করলেন। দৈবাত্ উদয় হলেন সাধু। তিনি হাত বুলিয়ে দিলেন চুল্লিতে। শিখিয়ে দিলেন মণ্ডা তৈরির কলাকৌশল গোপালকে। দুধ ও চিনি দিয়ে তৈরি হলো মণ্ডা। গোপাল তার নব উদ্ভাবিত মণ্ডা পরিবেশন করলেন তত্কালীন মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর রাজদরবারে।
মণ্ডা খেয়ে মহারাজা পেলেন পরম তৃপ্তি, আর বাহবা দিলেন গোপালকে। শুরু হলো মণ্ডার যাত্রা। গোপাল সম্পর্কে জানা যায়, বাংলা ১২০৬ সালে তত্কালীন ভারতবর্ষের মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণকারী গোপাল পাল বাংলা ১৩১৪ সালে পরলোকগমণ করেন। নবাব সিরাজদ্দৌলার মৃত্যুর পর গোপাল মাতৃভূমি রাজশাহীতে চলে আসেন। পরে বাংলা ১২৩০ সালে তিনি মুক্তাগাছায় বসত গড়েন। প্রথম মণ্ডা তৈরি হয় বাংলা ১২৩১ সালে।
মণ্ডার মূল উপাদান দুধ ও চিনি। বর্তমানে ২০টির এক কেজি মণ্ডা ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। মণ্ডা তৈরির পর ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয় না। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় গরমের সময় ৩/৪ দিন ও শীতকালে ১০/১২ দিন ভালো থাকে।
পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান কৃষ্ণ রায়, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সারোদ বাদক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ মণ্ডা খেয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। উল্লেখ্য যে, ময়মনসিংহ শহরে ও মুক্তাগাছার বেশকিছু দোকানে মণ্ডা বিক্রি হয়। যা আসল মণ্ডা নয়। আসল মণ্ডা একমাত্র গোপাল পালের আদি মণ্ডা হিসেবে পরিচিত, যার কোনো শাখা নেই।




No comments:
Post a Comment